Procrastination কী? Procrastination এর দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়ার কৌশল
আমরা সবাই কখনও না কখনও প্রক্রাস্টিনেশন (Procrastination) বা কাজ পেছানোর সমস্যায় ভুগেছি। একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় ফেসবুক স্ক্রল করছি, ইউটিউব দেখছি, অথবা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। এই অভ্যাস আমাদেরকে আমাদের মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং মানসিক চাপ বাড়িয়ে তোলে। তবে এই Procrastination এর দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়া সম্ভব। আজকের এই ব্লগে আমরা প্রক্রাস্টিনেশন কেন হয় এবং কীভাবে তা কাটিয়ে ওঠা যায় সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
Procrastination কী?
Procrastination হলো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করতে ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা অনিচ্ছেকৃতভাবে দেরি করা। যদিও আমরা জানি যে, এর ফলে আমাদের নেতিবাচক পরিণতি হতে পারে।
আমরা সবাই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে procrastination বা কাজে গড়িমসির শিকার হয়েছি। এটি একটি সাধারণ মনঃস্তাত্ত্বিক প্রবণতা যা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো পিছিয়ে দিতে এবং অপেক্ষাকৃত কম জরুরি কিন্তু সহজ- এমন কাজগুলোতে মনোনিবেশ করতে প্ররোচিত করে।
কিন্তু এই অভ্যাস যখন নিয়মিত হয়ে যায়, তখন এটি আমাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
আসুন procrastination এর কারণগুলো এবং Procrastination এর দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়ার বিস্তারিত কৌশলগুলো জেনে নিই।
Procrastination কেন হয়?
পূর্বেই বলেছি এটি একটি মনঃস্তাত্ত্বিক বিষয়। এটি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। তবে বেশিরভাগেরই মনে হয় এটি আসলে একপ্রকার অলসতা। কিন্তু এটি শুধুমাত্র অলসতা নয়; এর পিছনে জটিল মনোবৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে।
চলুন সেই কারণগুলো জেনে নেওয়া যাক:
১. ভয় ও অনিশ্চয়তা
অনেক সময় আমরা ব্যর্থতার ভয়ে বা ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে কাজ শুরু করতে ইতস্তত করি। ফলাফল কী হবে না হবে তা ভেবে অনেকেই দোটানায় বা ভয়ে ভয়ে থাকেন। যা তার কাজকে পিছিয়ে দেয়।
২. পারফেকশনিজম বা নিখুঁত থাকার চিন্তা
সবকিছু নিখুঁত করার চাপ আমাদের কাজ শুরু করতে বাধা দিতে পারে। মানুষ মাত্রই ভুল। কোনো কাজে ভুল হতেই পারে, সেটা মেনে নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু ভুল যাতে না হয় তার জন্য কাজটি একদম নিখুঁতভাবে করার চেষ্টা করে কেউ কেউ। কিন্তু তাতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, ফলে কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না।
৩. অতিরিক্ত কাজের চাপ
যখন কাজের পরিমাণ অত্যধিক মনে হয়, তখন আমরা হতাশ হয়ে পড়ি এবং নতুন কাজটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।
৪. পুরস্কারের অভাব
মানুষ স্বভাবগতভাবে দীর্ঘমেয়াদী লাভের চেয়ে তাৎক্ষণিক আনন্দকে বেশি গুরুত্ব দেয়। যখন কোনো কাজ করার পরে তাৎক্ষণিক কোনো পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না, তখন আমরা সেই কাজটি করতে অনীহা দেখাই।
৫. মুড ম্যানেজমেন্টের ঘাটতি
কখনও কখনও আমরা মনে করি যে, পরে আমাদের মন ভালো থাকবে তখন কাজটি করবো। এই মুড ম্যানেজমেন্টের কমতি থাকায় কাজে মনোযোগ দেওয়া হয়ে ওঠে না।
৬. ফোকাস করার অক্ষমতা
বর্তমান ডিজিটাল যুগে, বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিমূলক বিষয় আমাদের মনোযোগকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তাতে আমরা আমাদের কাজের উপর মনোযোগ ও মনোবল দুটোই হারিয়ে ফেলি। ফলে কাজটি বাকির খাতায় জমা হয়।
৭. কাজকে খুব বড় মনে করা
যখন কোনো কাজকে খুব বড় এবং জটিল মনে হয়, তখন আমরা সেটা করতে ভয় পাই এবং এড়িয়ে চলতে চাই। যা কাজের গতি পিছিয়ে দেয়।
৮. পারিপার্শ্বিক পরিবেশ
মনোযোগে ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী পরিবেশ, যেমন- উচ্চ শব্দ, বিরক্তিকর বিষয়বস্তু, পর্যাপ্ত জিনিসপত্রের অভাব ইত্যাদি আমাদেরকে কাজে মনোযোগ দিতে বাধা দেয়। ফলে কাজটি আমাদের পর্যাপ্ত মনোযোগ পায় না।
৯. মানসিক অবস্থা
সবচেয়ে বেশি যে কারণটি procrastination এর জন্য দায়ী, সেটি হলো আমাদের মানসিক অবস্থা। সবসময় আমাদের মানসিক অবস্থা একরকম থাকে না। উদাসীনতা, বিষন্নতা বা ডিপ্রেশন, অবসাদ, দুশ্চিন্তার মতো মানসিক অবস্থা আমাদেরকে কাজ করার মনোবলকে নষ্ট করে দেয়।
আবার কিছু মানসিক অবস্থা যেমন- যাদের OCD (Obsessive-Compulsive Disorder) এর মতো ভয়াবহ মানসিক সমস্যা আছে, তারা সামাজিকতার ভয়, নিখুঁত করার চিন্তা, গুছিয়ে রাখার চেষ্টা - ইত্যাদির মতো কারণে procrastination এর দুষ্টচক্রে আবদ্ধ হয়ে যায়।
Procrastination এর নেতিবাচক প্রভাব
১. মানসিক চাপ বা স্ট্রেস বৃদ্ধি: যত বেশি আমরা কাজ পিছিয়ে দিই, তত বেশি মানসিক চাপ বাড়ে।
২. কাজের মান হ্রাস পাওয়া: শেষ মুহূর্তে করা কাজ প্রায়ই মানসম্মত হয় না, কাজে বেশকিছু ঘাটতি থেকে যায়।
৩. সুযোগ হারানো: নিয়মিত এই অভ্যাস চালু থাকলে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগগুলো হাতছাড়া হতে পারে।
৪. আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া: বারবার কাজ পিছিয়ে দেওয়া আমাদের আত্মবিশ্বাসকে প্রভাবিত করে, নিজের উপর আত্মবিশ্বাস কমে যায়।
৫. সম্পর্কের উপর প্রভাব: মনঃস্তাত্ত্বিক এই ব্যাপারটি আপনার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেকেই আপনার পরিস্থিতি না বোঝে আপনাকে নিয়ে খারাপ ধারণা পোষণ করতে পারে যা সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে।
৬. স্বাস্থ্যগত সমস্যা: দীর্ঘমেয়াদী procrastination মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাতে কেউ ডিপ্রেশনে ভুগতে পারে, কেউ কেউ নিজের যত্নের ব্যাপারে উদাসীন হতে পারে।
Procrastinationএর দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়ার কৌশল
সবার মাঝেই কমবেশি এই সমস্যাটি থাকে। কিন্তু এটি যদি নিয়মিত অভ্যাস হয়ে যায়, তাহলে তা নিজের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। তাই procrastination দুষ্টচক্র ভাঙতে হবে।
চলুন এখন জেনে নিই প্রক্রাস্টিনেশন থেকে বের হওয়ার কৌশল:
১. কাজকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিন
একটি বড় কাজকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিন এবং প্রতিটি অংশকে আলাদা আলাদা করে শেষ করুন। এতে কাজটি দেখে আপনার ভয় দূর হবে এবং আপনি সহজেই তা শুরু ও শেষ করতে পারবেন।
২. সময়সূচি তৈরি করুন
একটি বিস্তারিত সময়সূচি তৈরি করুন এবং কখন কোন কাজটি করবেন তা নির্ধারণ করে নিন। সময়সূচি অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করুন। এতে কাজ করতে মনোবল ঠিক থাকবে।
৩. SMART গোল সেট করুন
SMART (Specific, Measurable, Achievable, Relevant, Time-bound) গোল সেট করা procrastination কমাতে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, "আগামী মাসে আমি ওজন কমাবো" এর পরিবর্তে "আগামী ৩০ দিনে প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটবো এবং ২ কেজি ওজন কমাবো" - এই ধরনের নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
৪. আরামদায়ক কর্ম পরিবেশ তৈরি করুন
একটি শান্ত এবং সুন্দর কর্ম পরিবেশ তৈরি করুন। কাজের সময় সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকুন। এতে করে আপনার কাজের উপর ফোকাস বাড়বে এবং কাজটি সহজেই শেষ করতে পারবেন। আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে একটি পরিষ্কার ও সুসজ্জিত জায়গা বেছে নিন, আপনার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হাতের কাছে রাখুন, বিরক্তিকর জিনিসপত্র দূরে রাখুন, সেখানে পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন।
৫. বিশ্বস্ত মানুষের সাহায্য নিন
যদি আপনি একা কাজ করতে না পারেন, তাহলে কাছের কোনো বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা যাকে বিশ্বাস করেন তার সাহায্য নিন। কয়েকজন মিলে কাজটি ভাগ করে নিলে সময় যেমন কম লাগবে, কাজটিও সহজ হবে।
৬. সবসময় ইতিবাচক বা পজিটিভ চিন্তা করুন
নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন এবং পজিটিভ চিন্তা করুন। ব্যর্থ হওয়ার ভয়কে কাটিয়ে উঠুন। সব কাজেই আপনি সফল হবেন না- এই বলে নিজেকে প্রস্তুত করুন। এতে করে কাজের প্রতি আপনার ভয় কমবে, আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
৭. নিজেকে অনুপ্রাণিত করুন
অনুপ্রেরণা এমন একটি বিষয় যা মুহূর্তের মধ্যে কারও মধ্যে অসম্ভবকে সম্ভব করার শক্তি জোগায়। প্রতিদিন সকালে নিজেকে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করুন। তার জন্য কোনো অনুপ্রেরণামূলক উক্তি বা ছবি দেখতে পারেন, বিখ্যাত ব্যক্তিদের বই পড়তে পারেন, নিজ নিজ ধর্মকর্ম করতে পারেন।
৮. বিরতি নিন
আপনি যন্ত্র নন, মানুষ। একটানা কাজ করতে থাকলে একঘেয়েমি চলে আসতে পারে। তাই কাজ করার সময় মাঝে মাঝে বিরতি নিন। এটি আপনাকে কাজ করার পূর্ণশক্তি জোগাবে এবং কাজে নতুন উদ্যমে ফিরে আসতে সাহায্য করবে। এর জন্য একটি জনপ্রিয় কৌশল অবলম্বন করতে পারেন। কৌশলটি হলো - ২৫ মিনিট একটানা কাজ করে ৫ মিনিট বিরতি নিন। ১০০ মিনিট কাজ করার পর ১৫-৩০ মিনিটের একটি দীর্ঘ বিরতি নিন। এতে আপনার মনোবল এবং ফোকাস বাড়বে।
৯. নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিন
স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে কাজে ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবণা বেশি। তাই সকলের উচিত স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া । নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খান, নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং পর্যাপ্ত ঘুমান। একটি সুস্থ শরীর একটি সুস্থ মন তৈরি করে। আর একটি সুস্থ মন একটি কাজকে পরিপূর্ণ করে।
১০. আপনার procrastination প্যাটার্ন চিহ্নিত করুন
নিজের আচরণ পর্যবেক্ষণ করুন। কোন ধরনের কাজগুলোতে আপনি বেশি গড়িমসি করেন? কখন এমন হয়? কী কী পরিস্থিতিতে আপনি এমনটা করেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করলে আপনি আপনার procrastination এর মূল কারণ বুঝতে পারবেন।
১১. "Eat That Frog" কৌশল অনুসরণ করুন
ব্রায়ান ট্রেসি এই নামে একটি বই প্রকাশ করেছেন, যেখানে procrastination থেকে বের হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশল তিনি তুলে ধরেছেন। এই বাক্যের এর অর্থ হলো- দিনের সবচেয়ে কঠিন বা বিরক্তিকর কাজটি প্রথমেই সেরে ফেলা। এটি আপনাকে একটি কাজ শেষ করার তৃপ্তি দেবে এবং বাকি দিনের জন্য কর্ম চঞ্চল রাখবে।
১২. টেকনোলজি ব্যবহার করুন
বিভিন্ন অ্যাপ ও সফটওয়্যার আপনাকে সময় ব্যবস্থাপনা বা Time Management ও কাজের অগ্রগতি ট্র্যাক করতে সাহায্য করবে। তাতে নিজের কাজ সম্পর্কে আপনার ধারণা থাকবে এবং কাজটি শেষ করতে একপ্রকার তাড়না কাজ করবে। কিছু জনপ্রিয় অ্যাপ হলো:
Trello: প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের জন্য
Forest: ফোন ব্যবহার কমানোর জন্য
RescueTime: সময়ের হিসাব রাখার জন্য
১৩. নিজেকে পুরস্কৃত করুন
ছোট ছোট সাফল্যকেও স্বীকৃতি দিন। প্রতিটি লক্ষ্য পূরণের পর নিজেকে একটি ছোট পুরস্কার হলেও দিন। এটি আপনার মস্তিষ্কে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করবে। অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিরাও এই কাজটি করে থাকেন।
১৪. পারফেকশনিজম ত্যাগ করুন
কোনো কাজ পারফেক্ট করার চেয়ে কাজটি আগে শেষ হওয়া বেশি ভালো। নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা আপনাকে কাজটি শুরু করতে যেমন দেরি করাবে, শেষ করতেও অনেক সময় লাগাবে। তাই নিখুঁত করার চেয়ে কাজটি আগে নিয়ম অনুযায়ী শেষ করার চেষ্টা করুন।
১৫. চিকিৎসকের সাহায্য নিন
মাঝেমধ্যে পরিস্থিতির কারণে কাজে গড়িমসি হতেই পারে। কিন্তু যদি তা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়, তাহলে সেটা চিন্তার বিষয়। যদি আপনার প্রক্রাস্টিনেশনের সমস্যা খুব গভীর হয়, তাহলে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।
উপসংহার
Procrastination একটি সাধারণ সমস্যা। তবে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। উপরের বর্ণিত উপায়গুলো অনুসরণ করে আপনি procrastination দুষ্টচক্র ভাঙ্গতে পারবেন এবং আপনার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবেন। মনে রাখবেন, সফলতা অর্জনের জন্য ধৈর্য এবং নিরন্তর চেষ্টা করা জরুরি।